n শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত //////////২০ - 13 September 2011 - হিন্দু ধর্ম ব্লগ - A Total Knowledge Of Hinduism, সনাতন ধর্ম Hinduism Site
Thursday
19-09-2019
2:23 PM
Login form
Search
Calendar
Entries archive
Tag Board
300
Site friends
  • Create a free website
  • Online Desktop
  • Free Online Games
  • Video Tutorials
  • All HTML Tags
  • Browser Kits
  • Statistics

    Total online: 1
    Guests: 1
    Users: 0

    Hinduism Site

    হিন্দু ধর্ম ব্লগ

    Main » 2011 » September » 13 » শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত //////////২০ Added by: নামহীন
    12:16 PM
    শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত //////////২০
    পঞ্চম পরিচ্ছেদ
    ১৮৮২, ১৬ই - ১৭ই অক্টোবর

    কীর্তনানন্দে নরেন্দ্র প্রভৃতি সঙ্গে — নরেন্দ্রকে প্রেমালিঙ্গন

    বৈকাল হইয়াছে — নরেন্দ্র গান গাহিতেছেন — রাখাল, লাটু, মাস্টার, নরেন্দ্রের ব্রাহ্মবন্ধু প্রিয়, হাজরা — সকলে আছেন।

    নরেন্দ্র কীর্তন গাহিলেন, খোল বাজিতে লাগিল:

    চিন্তয় মম মানস হরি চিদঘন নিরঞ্জন;
    কিবা অনুপম ভাতি, মোহন মূরতি, ভকত-হৃদয়-রঞ্জন।
    নবরাগে রঞ্জিত, কোটি শশী-বিনিন্দিত,
    (কিবা) বিজলি চমকে, সেরূপ আলোকে, পুলকে শিহরে জীবন।
    হৃদি-কমলাসনে ভাব তাঁর চরণ,
    দেখ শান্ত মনে, প্রেমনয়নে, অপরূপ প্রিয়দর্শন।
    চিদানন্দরসে, ভক্তিযোগাবেশে, হও রে চিরমগন।

    নরেন্দ্র আবার গাহিলেন:

    (১) সত্যং শিব সুন্দর ভাতি হৃদি মন্দিরে।
    নিরখি নিরখি অনুদিন মোরা ডুবিব রূপসাগরে।
    (সেদিন কবে হবে) (দীনজনের ভাগ্যে নাথ)।
    জ্ঞান-অনন্তরূপে পশিবে নাম মম হৃদে,
    অবাক্‌ হইয়ে অধীর মন শরণ লইবে শ্রীপদে।
    আনন্দ-অমৃতরূপে উদিবে হৃদয়-আকাশে,
    চন্দ্র উদিলে চকোর যেমন ক্রীড়য়ে মন হরষে,
    আমরাও নাথ, তেমনি করে মাতিব তব প্রকাশে।
    শান্তং শিব অদ্বিতীয় রাজ-রাজ-চরণে,
    বিকাইব ওহে প্রাণসখা, সফল করিব জীবনে।
    এমন অধিকার, কোথা পাব আর, স্বর্গভোগ জীবনে (সশরীরে)।
    শুদ্ধমপাপবিদ্ধং রূপ, হেরিয়ে নাথ তোমার,
    আলোক দেখিলে আঁধার যেমন যায় পলাইয়ে সত্বর;
    তেমনি নাথ তোমার প্রকাশে পলাইবে পাপ-আঁধার।
    ওহে ধ্রুবতারা-সম হৃদে জ্বলন্ত বিশ্বাস হে,
    জ্বালি দিয়ে দীনবন্ধু পুরাও মনের আশ;
    আমি নিশিদিন প্রেমানন্দে মগন হইয়ে হে;
    আপনার ভুলে যাব, তোমারে পাইয়ে হে।
    (সেদিন কবে হবে হে।)

    (২) আনন্দবনে মল মধুর ব্রহ্মনাম।
    নামে উথলিবে সুধাসিন্ধু পিয় অবিরাম। (পান কর আর দান কর হে)।
    যদি হয় কখন শুষ্ক হৃদয়, কর নামগান।
    (বিষয়-মরীচিকায় পড়ে হে) (প্রেমে হৃদয়, সরস হবে হে)
    (দেখ যেন ভুল না রে সেই মহামন্ত্র)।
    সবে হুঙ্কারিয়ে ছিন্ন কর পাপের বন্ধন। (জয় ব্রহ্ম জয় বল হে)।
    এস ব্রহ্মানন্দে বাতি সবে হই পূর্ণকাম। (প্রেমযোগে যোগী হয়ে হে)।

    খোল করতাল লইয়া কীর্তন হইতেছে। নরেন্দ্রাদি ভক্তেরা ঠাকুরকে বেড়িয়া বেড়িয়া কীর্তন করিতেছেন। কখন গাহিতেছেন, “প্রেমানন্দ রসে হও রে চিরগমন!” আবার কখন গাহিতেছেন, “সত্যং শিব সুন্দররূপ ভাতি হৃদিমন্দিরে।”

    অবশেষে নরেন্দ্র নিজে খোল ধরিয়াছেন ও মত্ত হইয়া ঠাকুরের সঙ্গে গাহিতেছেন, “আনন্দবদনে বল মধুর হরিনাম।”

    কীর্তনান্তে নরেন্দ্রকে ঠাকুর অনেকক্ষণ করিয়া বারবার আলিঙ্গন করিলেন! বলিতেছেন, “তুমি আজ আমায় আনন্দ দিলে!!!”

    আজ ঠাকুরের হৃদয়মধ্যস্থ প্রেমের উৎস উচ্ছ্বসিত হইয়াছে। রাত প্রায় আটটা। তথাপি প্রেমোন্মত্ত হইয়া একাকী বারান্দায় বিচরণ করিতেছেন। উত্তরের লম্বা বারান্দায় আসিয়াছেন ও দ্রুতপদে বারান্দার এক সীমা হইতে অন্য সীমা পর্যন্ত পাদচারণ করিতেছেন। মাঝে মাঝে মার সঙ্গে কি কথা কহিতেছেন। হঠাৎ উন্মত্তের ন্যায় বলিয়া উঠিলেন, “তুই আমার কি করবি?”

    মা যার সহায় তার মায়া কি করিতে পারে। এই কথা কি বলিতেছেন?

    নরেন্দ্র, মাস্টার, প্রিয় রাত্রে থাকিবেন। নরেন্দ্র থাকিবেন; ঠাকুরের আনন্দের সীমা নাই। রাত্রিকালীন আহার প্রস্তুত। শ্রীশ্রীমা নহবতে আছেন। রুটি ছোলার ডাল ইত্যাদি প্রস্তুত করিয়া ভক্তেরা খাইবেন বলিয়া পাঠাইয়াছেন। ভক্তেরা মাঝে মাঝে থাকেন; সুরেন্দ্র মাসে মাসে কিছু খরচ দেন।

    আহার প্রস্তুত। ঠাকুরের ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব বারান্দায় জায়গা হইতেছে।

    নরেন্দ্র প্রভৃতিকে স্কুল ও অন্যান্য বিষয়কথা কহিতে নিষেধ

    ঘরের পুর্বদিকের দরজার কাছে নরেন্দ্রাদি গল্প করিতেছেন।

    নরেন্দ্র — আজকাল ছোকরারা কিরকম দেখছেন?

    মাস্টার — মন্দ নয়, তবে ধর্মোপদেশ কিছু হয় না।

    নরেন্দ্র — নিজে যা দেখেছি, তাতে বোধ হয় সব অধঃপাতে যাচ্ছে। বার্ডসাই, ইয়ার্কি, বাবুয়ানা, স্কুল পালানো — এ-সব সর্বদা দেখা যায়। এমন কি দেখেছি যে, কুস্থানেও যায়।

    মাস্টার — যখন পড়াশুনা করতাম, আমরা তো এরূপ দেখি নাই, শুনি নাই।

    নরেন্দ্র — আপনি বোধ হয় তত মিশতেন না। এমন দেখেছি যে, খারাপ লোকে নাম ধরে ডাকে; কখন আলাপ করেছে কে জানে!

    মাস্টার — কি আশ্চর্য!

    নরেন্দ্র — আমি জানি, অনেকের চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে। স্কুলের কর্তৃপক্ষীয়েরা ও ছেলেদের অভিভাবকেরা এ-সব বিষয় দেখেন তো ভাল হয়।

    ঈশ্বরকথাই কথা — “আত্মানং বা বিজানীথ অন্যাং বাচং বিমুঞ্চথ”

    এইরূপ কথাবার্তা চলিতেছে, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ঘরের ভিতর হইতে তাঁহাদের কাছে আসিলেন ও হাসিতে হাসিতে বলিতেছেন, “কি গো, তোমাদের কি কথা হচ্ছে?” নরেন্দ্র বলিলেন, “এঁর সঙ্গে স্কুলের কথাবার্তা হচ্ছিল। ছেলেদের চরিত্র ভাল থাকে না।” ঠাকুর একটু ওই সকল কথা শুনিয়া মাস্টারকে গম্ভীরভাবে বলিতেছেন, “এ-সব কথাবার্তা ভাল নয়। ঈশ্বরের কথা বই অন্য কথা ভাল নয়। তুমি এদের চেয়ে বয়সে বড়, বুদ্ধি হয়েছে, তোমার এ-সব কথা তুলতে দেওয়া উচিত ছিল না।” (নরেনেদ্রর বয়স তখন ১৯/২০; মাস্টারের ২৭/২৮)

    মাস্টার অপ্রস্তুত। নরেন্দ্রাদি ভক্তগণ চুপ করিয়া রহিলেন।

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দাঁড়াইয়া হাসিতে হাসিতে নরেন্দ্রাদি ভক্তগণকে খাওয়াইতেছেন। ঠাকুরের আজ মহা আনন্দ।

    নরেন্দ্রাদি ভক্তেরা আহার করিয়া ঠাকুরের ঘরের মেঝেতে বসিয়া বিশ্রাম করিতেছেন ও ঠাকুরের সঙ্গে গল্প করিতেছেন। আনন্দের হাট বসিয়াছে। কথা কহিতে কহিতে নরেন্দ্রকে ঠাকুর বলিতেছেন, “চিদাকাশে হল পূর্ণ প্রেমচন্দ্রোদয় হে এই গানটি একবার গা না।”

    নরেন্দ্র গাহিতে আরম্ভ করিলেন। অমনি সঙ্গে সঙ্গে খোল করতাল অন্য ভক্তগণ বাজাইতে লাগিলেন:

    চিদাকাশে হল পূর্ণ প্রেমচন্দ্রোদয় হে।
    উথলিল প্রেমসিন্ধু কি আনন্দময় হে।
    (জয় দয়াময়, জয় দয়াময়, জয় দয়াময়)
    চারিদিকে ঝলমল করে ভক্ত গ্রহদল,
    ভক্তসঙ্গে ভক্তসখা লীলারসময় হে।
    (জয় দয়াময়, জয় দয়াময়, জয় দয়াময়)
    স্বর্গের দুয়ার খুলি, আনন্দ-লহরী তুলি;
    নববিধান-বসন্ত-সমীরণ বয়,
    ছুটে তাহে মন্দ মন্দ লীলারস প্রেমগন্ধ,
    ঘ্রাণে যোগিবৃন্দ যোগানন্দে মত্ত হয় হে।
    (জয় দয়াময়, জয় দয়াময়, জয় দয়াময়)
    ভবসিন্ধুজলে, বিধান-কমলে, আনন্দময়ী বিরাজে,
    আবেশে আকুল, ভক্ত অলিকুল, পিয়ে সুধা তার মাঝে।
    দেখ দেখ মায়ের প্রসন্নবদন চিত্ত-বিনোদন ভুবন-মোহন,
    পদতলে দলে দলে সাধুগণ, নাচে গায় প্রেমে হইয়ে মগন;
    কিবা অপরূপ আহা মরি মরি, জুড়াইল প্রাণ দরশন করি
    প্রেমদাসে বলে সবে পায়ে ধরি, গাও ভাই মায়ের জয় ৷৷

    কীর্তন করিতে করিতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নৃত্য করিতেছেন। ভক্তেরাও তাঁহাকে বেড়িয়া নৃত্য করিতেছেন।

    কীর্তনান্তে ঠাকুর উত্তর-পূর্ব বারান্দায় বেড়াইতেছেন। হাজরা মহাশয় বারান্দার উত্তরাংশে বসিয়া আছেন। ঠাকুর সেখানে গিয়া বসিলেন; মাস্টার সেইখানে বসিয়াছেন ও হাজরার সঙ্গে কথা কহিতেছেন। ঠাকুর একটি ভক্তকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি স্বপ্ন-টপ্ন দেখ?”

    ভক্ত — একটি আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি; এই জগৎ জলে জল। অনন্ত জলরাশি! কয়েকখানা নৌকা ভাসিতেছিল; হঠাৎ জলোচ্ছ্বাসে ডুবে গেল। আমি আর কয়টি লোক জাহাজে উঠেছি; এমন সময়ে সেই অকূল সমুদ্রের উপর দিয়ে এক ব্রাহ্মণ চলে যাচ্ছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কেমন করে যাচ্ছেন?” ব্রাহ্মণটি একটু হেসে বললেন, “এখানে কোন কষ্ট নাই; জলের নিচে বরাবর সাঁকো আছে।” জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কোথায় যাচ্ছেন?” তিনি বললেন, “ভবানীপুর যাচ্ছি।” আমি বললাম, “একটু দাঁড়ান; আমিও আপনার সঙ্গে যাব।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ — আমার এ-কথা শুনে রোমাঞ্চ হচ্ছে!

    ভক্ত — ব্রাহ্মণটি বললেন, “আমার এখন তাড়াতাড়ি; তোমার নামতে দেরি! এখন আসি। এই পথ দেখে রাখ, তুমি তারপর এস।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ — আমার রোমাঞ্চ হচ্ছে! তুমি শীঘ্র মন্ত্র লও।

    রাত এগারটা হইয়াছে। নরেন্দ্রাদি ভক্তগণ ঠাকুরের ঘরের মেঝেতে বিছানা করিয়া শয়ন করিলেন।

    নিদ্রাভঙ্গের পর ভক্তেরা কেউ কেউ দেখিতেছেন যে, প্রভাত হইয়াছে (১৭ই অক্টোবর, ১৮৮২; মঙ্গলবার, ১লা কার্তিক, শুক্লা পঞ্চমী)। শ্রীরামকৃষ্ণ বালকের ন্যায় দিগম্বর, ঠাকুরদের নাম করিতে করিতে ঘরে বেড়াইতেছেন। কখন গঙ্গাদর্শন, কখন ঠাকুরদের ছবির কাছে গিয়া প্রণাম, কখন বা মধুর স্বরে নামকীর্তন। কখন বলিতেছেন, বেদ, পুরাণ, তন্ত্র, গীতা, গায়ত্রী, ভাগবত-ভক্ত-ভগবান। গীতা উদ্দেশ করিয়া অনেকবার বলিতেছেন, ত্যাগী ত্যাগী ত্যাগী ত্যাগী। কখন বা — তুমিই ব্রহ্ম, তুমিই শক্তি; তুমিই পুরুষ, তুমিই প্রকৃতি; তুমিই বিরাট, তুমিই স্বরাট; তুমিই নিত্য, তুমিই লীলাময়ী; তুমিই চতুর্বিংশতি তত্ত্ব।

    এদিকে ৺কালীমন্দিরে ও ৺রাধাকান্তের মন্দিরে মঙ্গল আরতি হইতেছে ও শাঁখঘন্টা বাজিতেছে। ভক্তেরা উঠিয়া দেখিতেছেন কালীবাড়ির পুষ্পোদ্যানে ঠাকুরদের পূজার্থ পুষ্পচয়ন আরম্ভ হইয়াছে ও প্রভাতী রাগের লহরী উঠাইয়া নহবত বাজিতেছে।

    নরেন্দ্রাদি ভক্তগণ প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া ঠাকুরের কাছে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ঠাকুর হাস্যমুখ, উত্তর-পূর্ব বারান্দার পশ্চিমাংশে দাঁড়াইয়া আছেন।

    নরেন্দ্র — পঞ্চবটীতে কয়েকজন নানাকপন্থী সাধু বসে আছে দেখলুম।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — হাঁ, তারা কাল এসেছিল! (নরেন্দ্রকে) তোমরা সকলে একসঙ্গে মাদুরে বস, আমি দেখি।

    ভক্তেরা সকলে মাদুরে বসিলে ঠাকুর আনন্দে দেখিতে লাগিলেন ও তাঁহাদের সহিত গল্প করিতে লাগিলেন। নরেন্দ্র সাধনের কথা তুলিলেন।

    নরেন্দ্রাদিকে স্ত্রীলোক নিয়ে সাধন নিষেধ — সন্তানভাব অতি শুদ্ধ

    শ্রীরামকৃষ্ণ (নরেন্দ্রাদির প্রতি) — ভক্তিই সার। তাঁকে ভালবাসলে বিবেক বৈরাগ্য আপনি আসে।

    নরেন্দ্র — আচ্ছা, স্ত্রীলোক নিয়ে সাধন তন্ত্রে আছে?

    শ্রীরামকৃষ্ণ — ও-সব ভাল পথ নয়, বড় কঠিন, আর পতন প্রায়ই হয়। বীরভাবে সাধন, দাসীভাবে সাধন, আর মাতৃভাবে সাধন! আমার মাতৃভাব। দাসীভাবও ভাল। বীরভাবে সাধন বড় কঠিন। সন্তানভাব বড় শুদ্ধভাব।

    নানাকপন্থী সাধুরা ঠাকুরকে অভিবাদন করিয়া বলিলেন, “নমো নারায়ণায়।” ঠাকুর তাঁহাদের আসন গ্রহণ করিতে বলিলেন।

    ঈশ্বরে সব সম্ভব — Miracles

    ঠাকুর বলিতেছেন, ঈশ্বরের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। তাঁর স্বরূপ কেউ মুখে বলতে পারে না। সকলই সম্ভব। দুজন যোগী ছিল, ঈশ্বরের সাধনা করে। নারদ ঋষি যাচ্ছিলেন। একজন পরিচয় পেয়ে বললেন, “তুমি নারায়ণের কাছ থেকে আসছ, তিনি কি করছেন?” নারদ বললেন, “দেখে এলাম, তিনি ছুচের ভিতর দিয়ে উট হাতি প্রবেশ করাচ্ছেন, আবার বার করছেন।” একজন বললে, “তার আর আশ্চর্য কি! তাঁর পক্ষে সবই সম্ভব।” কিন্তু অপরটি বললে, “তাও কি হতে পারে! তুমি কখনও সেখানে যাও নাই।”

    বেলা প্রায় নয়টা। ঠাকুর নিজের ঘরে বসিয়া আছেন। মনোমহন কোন্নগর হইতে সপরিবারে আসিয়াছেন। মনোমোহন প্রণাম করিয়া বলিলেন, “এদের কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছি।” ঠাকুর কুশল প্রশ্ন করিয়া বলিলেন, “আজ ১লা, অগস্ত্য, কলকাতায় যাচ্ছ; কে জানে বাপু!” এই বলিয়া একটু হাসিয়া অন্য কথা কহিতে লাগিলেন।

    নরেন্দ্রকে মগ্ন হইয়া ধ্যানের উপদেশ

    নরেন্দ্র ও তাঁহার বন্ধুরা স্নান করিয়া আসিলেন। ঠাকুর ব্যগ্র হইয়া নরেন্দ্রকে বলিলেন, “যাও বটতলায় ধ্যান কর গে, আসন দেব?”

    নরেন্দ্র ও তাঁহার কয়টি ব্রাহ্মবন্ধু পঞ্চবটীমূলে ধ্যান করিতেছিলেন। বেলা প্রায় সাড়ে দশটা। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কিয়ৎক্ষণ পরে সেইখানে উপস্থিত; মাস্টারও আসিয়াছেন। ঠাকুর কথা কহিতেছেন —

    শ্রীরামকৃষ্ণ (ব্রাহ্মভক্তদের প্রতি) — ধ্যান করবার সময় তাঁতে মগ্ন হতে হয়। উপর উপর ভাসলে কি জলের নিচে রত্ন পাওয়া যায়?

    এই বলিয়া ঠাকুর মধুর স্বরে গান গাহিতে লাগিলেন:

    ডুব দে মন কালী বলে। হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে।
    রত্নাকর নয় শূন্য কখন, দু-চার ডুবে ধন না পেলে,
    তুমি দম-সামর্থ্যে একডুবে যাও, কুলকুণ্ডলিনীর কূলে।
    জ্ঞান-সমুদ্রের মাঝে রে মন, শান্তিরূপা মুক্তা ফলে,
    তুমি ভক্তি করে কুড়ায়ে পাবে, শিবযুক্তি মতো চাইলে। কামাদি ছয় কুম্ভীর আছে, আহার-লোভে সদাই চলে,
    তুমি বিবেক-হলদি গায়ে মেখে যাও, ছোঁবে না তার গন্ধ পেলে।
    রতন-মাণিক্য কতপড়ে আছে সেই জলে,
    রামপ্রসাদ বলে ঝম্প দিলে, মিলবে রতন ফলে ফলে।

    ব্রাহ্মসমাজ, বক্তৃতা ও সমাজসংস্কার (Social Reforms) — আগে ঈশ্বরলাভ, পরে লোকশিক্ষা প্রদান

    নরেন্দ্র ও তাঁহার বন্ধুগণ পঞ্চবটীর চাতাল হইতে অবতরণ করিলেন ও ঠাকুরের কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। ঠাকুর দক্ষিণাস্য হইয়া নিজের ঘরের দিকে তাঁহাদের সহিত কথা কহিতে কহিতে আসিতেছেন।

    ঠাকুর বলিতেছেন, “ডুব দিলে কুমির ধরতে পারে, কিন্তু হলুদ মাখলে কুমির ছোঁয় না। ‘হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে’ কামাদি ছয়টি কুমির আছে। কিন্তু বিবেক, বৈরাগ্যরূপ হলুদ মাখলে তারা আর তোমাকে ছোঁবে না।

    “পাণ্ডিত্য কি লেকচার কি হবে যদি বিবেক-বৈরাগ্য না আসে। ঈশ্বর সত্য আর সব অনিত্য; তিনিই বস্তু আর সব অবস্তু; এর নাম বিবেক।

    “তাঁকে হৃদয়মন্দিরে আগে প্রতিষ্ঠা কর। বক্তৃতা, লেকচার, তারপর ইচ্ছা হয়তো করো। শুধু ব্রহ্ম ব্রহ্ম বললে কি হবে, যদি বিবেক-বৈরাগ্য না থাকে? ও তো ফাঁকা শঙ্খধ্বনি?

    “এক গ্রামে পদ্মলোচন বলে একটি ছোকরা ছিল। লোকে তাকে পোদো পোদো বলে ডাকত। গ্রামে একটি পোড়ো মন্দির ছিল, ভিতরে ঠাকুর-বিগ্রহ নাই — মন্দিরের গায়ে অশ্বত্থগাছ, অন্যান্য গাছপালা হয়েছে। মন্দিরের ভিতরে চামচিকা বাসা করেছে। মেঝেতে ধুলা ও চামচিকার বিষ্ঠা। মন্দিরে লোকজনের আর যাতায়াত নাই।

    “একদিন সন্ধ্যার কিছু পরে গ্রামের লোকেরা শঙ্খধ্বনি শুনতে পেলে। মন্দিরের দিক থেকে শাঁখ বাজছে ভোঁ ভোঁ করে। গ্রামের লোকেরা মনে করলে, হয়তো ঠাকুর প্রতিষ্ঠা কেউ করেছে, সন্ধ্যার পর আরতি হচ্ছে। ছেলে, বুড়ো, পুরুষ, মেয়ে — সকলে দৌড়ে দৌড়ে মন্দিরের সম্মুখে গিয়ে উপস্থিত। ঠাকুরদর্শন করবে আর আরতি দেখবে। তাদের মধ্যে একজন মন্দিরের দ্বার আস্তে আস্তে খুলে দেখে, পদ্মলোচন একপাশে দাঁড়িয়ে ভোঁ ভোঁ শাঁখ বাজাচ্ছে। ঠাকুর প্রতিষ্ঠা হয় নাই — মন্দির মার্জনা হয় নাই — চামচিকার বিষ্ঠা রয়েছে। তখন সে চেঁচিয়া বলছে:

    “মন্দিরে তোর নাহিক মাধব!
    পোদো, শাঁখ ফুঁকে তুই করলি গোল!

    তায় চামচিকে এগার জনা, দিবানিশি দিচ্ছে থানা —

    “যদি হৃদয়মন্দিরে মাধব প্রতিষ্ঠা করতে চাও, যদি ভগবানলাভ করতে চাও, শুধু ভোঁ ভোঁ করে শাঁখ ফুঁকলে কি হবে! আগে চিত্তশুদ্ধি। মন শুদ্ধ হলে ভগবান পবিত্র আসনে এসে বসবেন। চামচিকার বিষ্ঠা থাকলে মাধবকে আনা যায় না। এগার জন চামচিকে একাদশ ইন্দ্রিয় — পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পাঁচ কর্মেন্দ্রিয় আর মন। আগে মাধব প্রতিষ্ঠা, তারপর ইচ্ছা হয় বক্তৃতা লেকচার দিও!

    “আগে ডুব দাও। ডুব দিয়ে রত্ন তোল, তারপর অন্য কাজ।

    “কেউ ডুব দিতে চায় না। সাধন নাই, ভজন নাই, বিবেক-বৈরাগ্য নাই, দু-চারটে কথা শিখেই অমনি লেকচার!

    “লোকশিক্ষা দেওয়া কঠিন। ....ভগবানকে দর্শনের পর যদি কেউ তাঁর আদেশ পায়, তাহলে লোকশিক্ষা দিতে পারে।”

    অবিদ্যা স্ত্রী — আন্তরিক ভক্তি হলে সকলে বশে আসে

    কথা কহিতে কহিতে ঠাকুর উত্তরের বারান্দার পশ্চিমাংশে আসিয়া দাঁড়াইলেন। মণি কাছে দাঁড়াইয়া। ঠাকুর বারবার বলিতেছেন, “বিবেক-বৈরাগ্য না হলে ভগবানকে পাওয়া যায় না।” মণি বিবাহ করিয়াছেন, তাই ব্যাকুল হইয়া ভাবিতেছেন, কি হইবে! বয়স ২৮, কলেজে পড়িয়া ইংরেজী লেখাপড়া কিছু শিখিয়াছেন। ভাবিতেছেন, বিবেক-বৈরাগ্য মানে কি কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগ?

    মণি (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি) — স্ত্রী যদি বলে, আমায় দেখছ না, আমি আত্মহত্যা করব; তাহলে কি হবে?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (গম্ভীরস্বরে) — অমন স্ত্রী ত্যাগ করবে, যে ঈশ্বরের পথে বিঘ্ন করে। আত্মহত্যাই করুক, আর যাই করুক।

    “যে ঈশ্বরের পথে বিঘ্ন দেয়, সে অবিদ্যা স্ত্রী।”

    গভীর চিন্তামগ্ন হইয়া মণি দেওয়ালে ঠেসান দিয়া একপাশে দাঁড়াইয়া রহিলেন। নরেন্দ্রাদি ভক্তগণও ক্ষণকাল অবাক্‌ হইয়া রহিলেন।

    ঠাকুর তাঁহাদের সহিত একটু কথা কহিতেছেন, হঠাৎ মণির কাছে আসিয়া একান্তে আস্তে আস্তে বলিতেছেন, “কিন্তু যার ঈশ্বরে আন্তরিক ভক্তি আছে, তার সকলেই বশে আসে — রাজা, দুষ্ট লোক স্ত্রী। নিজের আন্তরিক ভক্তি থাকলে স্ত্রীও ক্রমে ঈশ্বরের পথে যেতে পারে। নিজে ভাল হলে ঈশ্বরের ইচ্ছাতে সেও ভাল হতে পারে।”

    মণির চিন্তাগ্নিতে জল পড়িল। তিনি এতক্ষণ ভাবিতেছিলেন, আত্মহত্যা করে করুক, আমি কি করব?

    মণি (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি) — সংসারে বড় ভয়!

    শ্রীরামকৃষ্ণ (মণি ও নরেন্দ্রাদির প্রতি) — তাই চৈতন্যদেব বলেছিলেন, “শুন শুন নিত্যানন্দ ভাই সংসারী জীবের কভু গতি নাই।”

    (মণির প্রতি একান্তে একদিন বলিয়াছিলেন) — “ঈশ্বরেতে শুদ্ধাভক্তি যদি না হয়, তাহলে কোন গতি নাই। কেউ যদি ঈশ্বরলাভ করে সংসারে থাকে, তার কোন ভয় নাই। নির্জনে মাঝে মাঝে সাধন করে যদি শুদ্ধাভক্তিলাভ করতে পারে, সংসারে থাকলে তার কোন ভয় নাই! চৈতন্যদেবের সংসারী ভক্তও ছিল। তারা সংসারে নামমাত্র থাকত। অনাসক্ত হয়ে থাকত।”

    ঠাকুরদের ভোগারতি হইয়া গেল। অমনি নহবত বাজিতে লাগিল। এইবার তাঁহারা বিশ্রাম করিবেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আহারে বসিলেন। নরেন্দ্রাদি ভক্তগণ আজও ঠাকুরের কাছে প্রসাদ পাইবেন।
    Views: 457 | Added by: নামহীন | Tags: রাম | Rating: 0.0/0
    Total comments: 1
    0   Spam
    1 শকুন্তলা-দেবী   (13-09-2011 10:26 PM)
    biggrin biggrin biggrin biggrin biggrin +++++++++++

    onwk bhalo laglo

    Only registered users can add comments.
    [ Registration | Login ]